অজন্তা গুহাচিত্র

অজন্তা গুহাসমূহ ভারতের মহারাষ্ট্রে গভীর খাড়া গিরিখাতের পাথর কেটে খোদাই করা প্রায় ৩০টি গুহা-স্তম্ভ। গুহাগুলো মহারাষ্ট্রের আওরঙ্গবাদ জেলার জলগাঁও রেলস্টেশনের কাছে, আজিন্তা বা অজন্তা গ্রামের প্রান্তে অবস্থিত (২০ ডিগ্রি ৩০ মিনিট উত্তর অক্ষাংশ এবং ৭৫ ডিগ্রি ৪০ মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমাংশ)।
অজন্তা গুহাসমূহ ভারতের মহারাষ্ট্রে গভীর খাড়া গিরিখাতের পাথর কেটে খোদাই করা প্রায় ৩০টি গুহা-স্তম্ভ। এগুলো খ্রিষ্টপূর্ব দোসরা শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর মধ্যে নির্মিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এগুলোতে পাওয়া ছবি ও ভাস্কর্য, তৎকালীন বৌদ্ধধর্মীয় শিল্পের উৎকৃষ্ট নিদর্শন। অজন্তার দেয়ালের চিত্রগুলিতে বুদ্ধের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। ফ্রেস্কো ধাঁচের এই দেয়ালচিত্রগুলোর জীবন্তরূপ এবং এগুলো তে নানা রঙের সমৃদ্ধ ও সূক্ষ্ম প্রয়োগ এগুলোকে ভারতের বৌদ্ধ চিত্রশিল্পের সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শনে পরিণত করেছে। অজন্তার এসব গুহায় যেসব শিল্পকর্ম বা চিত্রকর্ম করা হয়েছে, তার অধিকাংশই বুদ্ধের জীবনীনির্ভর বা বুদ্ধের জাতককাহিনিনির্ভর। মূলত বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন, বুদ্ধ তথাকথিত পূর্ব-পূর্বজন্মে যেসব লীলা করেছেন, সেই জাতিস্মর মহাপুরুষ কথিত সেই সব কাহিনিই জাতকের গল্প বা কাহিনি হিসেবে ধরা হয়। কথিত আছে, এমন গল্পের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। অবশ্য সব গুহাতেই অজন্তার শিল্পীদের চিত্রকর্মের দেখা মেলেনি। কিছু গুহার চিত্রকর্ম হয়তো অনেক আগেই নষ্ট হয়েছে। আবার কিছু চিত্রকর্ম অজন্তা নতুন করে আবিষ্কারের পরও নষ্ট হয়েছে নানা কারণে। তবে এখন অজন্তার ১, ২, ৯, ১০, ১৬ ও ১৭ নম্বর গুহায় বেশিসংখ্যক দর্শনীয় চিত্রকর্মের দেখা মিলবে।
অজন্তার গুহাগুলো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বৌদ্ধ বিশ্বাসীরাই করেছেন, এটা সত্যি। তবু গুহাগুলোর ভেতরের ভাস্কর্যরীতির রিলিফ বা শিল্পকর্ম বা চিত্রকর্মগুলোতে দুটি ধারা বা দুটি যুগের ছাপ রয়েছে। একটি হীনযান বৌদ্ধ। অন্যটি মহাযান বৌদ্ধ। মূলত বুদ্ধের আদি অনুসারীরা হীনযানি বৌদ্ধ। তাঁরা বুদ্ধের মূর্তিপূজায় আগ্রহী ছিলেন না। তাই তাঁরা অজন্তার গুহায় বুদ্ধের মূর্তি খোদাই করেননি। এর বদলে তাঁরা বুদ্ধের সাংকেতিক কিছু চিহ্ন তৈরি করেছেন। যেমন স্তূপ, চরণচিহ্ন, পদ্ম ফুল, ধর্মচক্র, শূন্য রাজছত্র বা শূন্য রাজসিংহাসন ইত্যাদি। অজন্তার ৮, ৯, ১০, ১২ ও ১৩ গুহা মন্দিরগুলো এ হীনযান যুগের। প্রবেশ পথপ্রবেশ পথ যদি এ গুহাগুলোতে বুদ্ধের মূর্তি বা ছবি দেখেন, তাহলে বুঝে নেবেন এগুলো পরবর্তীকালে মহাযান যুগের সংযোজন। এ ছাড়া বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে অন্য ধর্ম, বিশেষ করে হিন্দুধর্মের বিভিন্ন দর্শনের সংমিশ্রণ করে নতুন আরেকটি বৌদ্ধ ধারা ঘটেছিল। এ ধারার অনুসারীরাই মহাযান যুগের বৌদ্ধ। তারা বুদ্ধের মূর্তিপূজায় আগ্রহী ছিলেন। সে জন্য তারা অজন্তার গুহায় বুদ্ধের মূর্তিসহ বিভিন্ন মূর্তি খোদাই করেছেন ও বুদ্ধের ছবি এঁকেছেন। সে হিসেবে অজন্তার অধিকাংশ গুহাই মহাযান যুগে নির্মিত। তবে প্রতিটি গুহার শিল্পকর্মেরই রয়েছে আলাদা আলাদা কাহিনি বা বৈচিত্র্য।
বুদ্ধের জন্মসময় স্পষ্ট নয়। বিভিন্ন মতানুযায়ী খ্রিষ্টপূর্ব ৫৬৩ বা ৫৬৬ বা ৫৫৬ বা ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে বুদ্ধের জন্ম হতে পারে। অথবা বলা যায় ষষ্ঠ থেকে চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে তাঁর জন্ম। তাঁর নাম ছিল সিদ্ধার্থ গৌতম। ছিলেন রাজপুত্র। ২৯ বছর বয়সে রাজগৃহ ত্যাগ করে নির্জনে তপস্যা করে কথিত বোধিত্ব লাভ করে গৌতম বুদ্ধ নামে পরিচিত হন। তাঁর দর্শনই পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধধর্ম হিসেবে পরিচিতি পায়। তিনি বেঁচে ছিলেন ৮০ বছর। মূলত তাঁর দেহত্যাগের আনুমানিক ৫০০ বছর পর হীনযানি বৌদ্ধ ও মহাযানি বৌদ্ধ ধারা দুটি দাঁড়ায়। সে হিসেবে বুদ্ধের দেহত্যাগের আনুমানিক ২০০ থেকে ৩০০ বছরের মাথায় বৌদ্ধ ভিক্ষু বা সন্ন্যাসীরা অজন্তায় উপাসনা বা ধর্মচর্চার জন্য এ গুহাগুলো নির্মাণ শুরু করেন।

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ